প্রকাশ :
ফুটবল ইতিহাসে কত বিতর্কিত গোলই তো আছে। কিন্তু ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের মতো এত বিতর্ক, দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব আর কোনোটির ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে এই গোল ক্ষোভেরও জন্ম দিয়েছে। গোলটি তিনি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করেছিলেন।
মেক্সিকো সিটির বাতাসে এক অদ্ভুত উপায়ে ঝুলে থাকা একটি মুষ্টিবদ্ধ হাত, আর তার পাশেই ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটন ব্যর্থভাবে শরীর প্রসারিত করে বলটি ধরার চেষ্টা করছেন। এটি ফুটবলে চিরস্থায়ী এক ছবিতে পরিণত হয়েছে। ৪০ বছর পর বুধবার এই দুই দল মুখোমুখি হচ্ছে। তাই চোখ বন্ধ করেই এই গোলের স্মৃতি আবারও সবার সামনে চলে আসছে। কিন্তু কী ছিল এই ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং এর তাৎপর্যই বা কী ছিল?
ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত গোল।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের অবসানের চার বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়ায় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। প্রথমার্ধ শেষে খেলাটি ০-০ সমতায় ছিল।
এরপর ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের নিজেদের সীমানা থেকে দৌড় শুরু করে পেনাল্টি বক্সের প্রান্তে থাকা সতীর্থ হোর্হে ভালদানোকে পাস দেন। ভালদানোর আলতো টোকায় বলটি তার নিয়ন্ত্রণ থেকে কিছুটা দূরে চলে যায়। কিন্তু ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার স্টিভ হজ অপ্রস্তুতভাবে বলটি পেছনের দিকে কিক করে নিজের ডি-বক্সের ভেতরে পাঠিয়ে দেন।
আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিধারী ম্যারাডোনা ও গোলরক্ষক পিটার শিলটন দুজনেই হাওয়ায় ভাসমান বলটি ধরতে লাফিয়ে ওঠেন। নিজের উচ্চতার ঘাটতি পুষিয়ে নিতে ম্যারাডোনা তার বাঁ হাত দিয়ে বলটি জালে পাঠিয়ে দেন। p>
তিনি উদযাপনে মেতে ওঠেন। ঘটনাটির ভিডিও মনোযোগ দিয়ে দেখলে দেখা যাবে তিনি গোলটি দেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে রেফারির দিকে কয়েক মুহূর্তের জন্য মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়েছিলেন।
গ্যারি লিনেকারসহ অন্যান্য ইংলিশ খেলোয়াড়দের আপত্তি সত্ত্বেও গোলটি বহাল থাকে।
এর মাত্র চার মিনিট পর, ম্যারাডোনা তার ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ করেন। যেখানে তিনি নিজের অর্ধ থেকে ড্রিবলিং শুরু করে ইংল্যান্ডের চারজন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করেন এবং গোল করার আগে শিলটনকেও কাটিয়ে বল জালে জড়ান।
ম্যারাডোনার ইচ্ছাকৃত হ্যান্ডবল এবং তার এই জাদুকরী মুহূর্তের বৈপরীত্যকে এখন অনেকেই তার ব্যক্তিসত্তার দুটি দিকের এক নিখুঁত প্রতিফলন হিসেবে দেখেন।
যদিও ম্যাচের শেষ বাঁশির আট মিনিট আগে লিনেকার একটি গোল শোধ করেছিলেন। আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত লিড ধরে রেখে জিতে যায়। পরবর্তীতে বেলজিয়াম ও পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি জয় করে।
সহজ কথায়, হ্যান্ডবলটি রেফারি আলী বিন নাসের ও ইংল্যান্ডের অর্ধে থাকা লাইন্সম্যান বোগদান দোচেভ উভয়েরই নজর এড়িয়ে গিয়েছিল।
হজ যখন বলটি ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুলবশত ম্যারাডোনার দিকে পাঠিয়ে দেন, তখন নাসের গোলপোস্ট থেকে প্রায় ৩০ গজ দূরে ছিলেন এবং হাত দিয়ে বল জালে পাঠানোর পরও তিনি গোলটি বহাল রাখেন।
অবসরের পর থেকে তিনি বেশ নিভৃতে জীবনযাপন করছেন। যদিও ২০২০ সালে ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর তিনি এই গোলটি নিয়ে কথা বলেছিলেন।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাসের বলেছিলেন, ‘ইংলিশ ডিফেন্ডারের কাছে বল ছিল, তিনি সেটি পেছনে পাঠান এবং ম্যারাডোনা পিটার শিলটনের সঙ্গে শূন্যে লাফিয়ে ওঠেন। তখন তারা দুজনেই আমার উল্টো দিকে মুখ করে ছিল। তাদের মুখ ছিল আমার সহকারী রেফারি বুলগেরিয়ার বোগদান দোচেভের দিকে। প্রথমে আমি কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। আমি দোচেভের দিকে তাকালাম। তিনি মাঠের মাঝখানের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন এবং গোলটি নিশ্চিত করছিলেন। তিনি হ্যান্ডবলের কোনো সংকেত দেননি।’
তবে ২০১৭ সালে মারা যাওয়া দোচেভ বলেছিলেন যে, তার হাত বাঁধা (রূপক অর্থে) ছিল। গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বুলগেরিয়ান সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘যদিও আমি তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পেরেছিলাম যে কিছু একটা অনিয়ম হয়েছে। কিন্তু তৎকালীন সময়ে ফিফা সহকারীদের রেফারির সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করার অনুমতি দিতো না।’
২০১৫ সালে নাসেরকে ম্যারাডোনা একটি আর্জেন্টিনার জার্সি উপহার দিয়েছিলেন, যাতে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল ‘আলীর জন্য, আমার চিরকালের বন্ধু।’