প্রকাশ :
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় করছাড়ের বড় ধরনের বাড়তি সুবিধা থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু কর অব্যাহতি বা করছাড়ই নয়, বরং ভ্যাট ও পণ্য আমদানির শুল্ক-করেও বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হতে পারে।
মূলত দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা, স্থানীয় শিল্পের সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাণিজ্যকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করতেই এই করছাড় দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ইলেকট্রনিক্স খাতকে সরকার সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এই খাতে সবচেয়ে বেশি ছাড় দেওয়া হতে পারে। এছাড়া, আগামী অর্থবছর থেকে এই করছাড় বা কর অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এই নীতির প্রভাবে দেশে উৎপাদিত এসি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, ওয়াশিং মেশিন ও সব ধরনের গৃহস্থালি (হাউজহোল্ড) পণ্য, সৌর বিদ্যুৎ, ইলেকট্রিক গাড়ি, ই-বাইক এবং দেশে তৈরি ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও মোবাইল সেটের দাম কমতে পারে।
অন্যদিকে, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সুখবর আসছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সব ধরনের ভ্যাট ও কর প্রত্যাহার করা হতে পারে। বর্তমানে তাদের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও ৭ শতাংশ আয়কর প্রযোজ্য রয়েছে।
তবে, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার অংশ হিসেবে আমদানি করা কাজু বাদাম, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর, প্রিন্টার, সিগারেট পেপার, বিদেশি মদ, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, দামি মাছ, সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ ইত্যাদির ওপর শুল্ক বাড়ায় এগুলোর দাম বাড়তে পারে।
যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে
১. দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য
দেশীয় শিল্পের সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ ও হাউজহোল্ড পণ্যের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। এনবিআর সূত্র জানায়, এই খাত থেকে সরকার পাঁচ থেকে ছয়শ কোটি টাকা ভ্যাট পায়। ভ্যাট ১৫ শতাংশ করার পরও রেয়াতের কারণে রাজস্ব আদায় বাড়েনি, বরং আগের মতোই রয়েছে। তাই ভ্যাট কমানোর পাশাপাশি এসব পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতেও শুল্ককর ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে, যার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে। এর ফলে দেশে তৈরি ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম কমবে।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকার এই খাতকে রপ্তানিমুখী করতে চায়। বিগত দুই অর্থবছরে শুল্ক-ভ্যাট বাড়ানোর ফলে এই পণ্যগুলোর আমদানি প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছিল। এতে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়লেও দেশীয় পণ্যের বিক্রি ও স্থানীয় বিনিয়োগ কমে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যায়। দেশীয় এই শিল্পে বর্তমানে ২২টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।
২. জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী
ওষুধ তৈরির ৬৮ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার হতে পারে, যার ফলে ওষুধের দাম কিছুটা কমবে। এছাড়া, হার্টের রিং ও চোখের লেন্সের ওপর থেকে ১০ শতাংশ ভ্যাট এবং ক্যান্সারের নয় ধরনের ওষুধ আমদানিতে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হতে পারে। ফলে এই চিকিৎসাসামগ্রীগুলোর দামও কমবে।নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য যেমন— ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ ৬০টি পণ্যের উৎসে কর ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে। ভোক্তা পর্যায়ে এসব পণ্যে কোনো ভ্যাট নেই। এছাড়া, আমদানি করা শিশুখাদ্যের দাম কমাতেও শুল্ক-করে ছাড় আসতে পারে।
৪. ভোজ্যতেল ও তেলবীজ
স্থানীয়ভাবে তেলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনের ওপর করহার আগামী ১০ বছর পর্যন্ত অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। এর ফলে এই খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
৫. সৌর প্যানেল ও ব্যাটারি
পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে করছাড় ২০৩০ সাল পর্যন্ত এবং সৌর বিদ্যুতের সব ধরনের উপকরণ আমদানিতে শুল্ককর অব্যাহতি ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। এছাড়া, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করমুক্ত রাখা এবং সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিদ্যুৎ বিলে ৫ শতাংশ রেয়াত দেওয়া হতে পারে। ফলে সৌর বিদ্যুতের উপকরণের দাম কমবে।
৬. ইলেকট্রিক গাড়ি, ই-বাইক ও হাইব্রিড গাড়ি
স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক উৎপাদনে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হতে পারে। ইলেকট্রিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে অগ্রিম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে গাড়ির কিলোওয়াট অনুযায়ী ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, ১৮०० সিসি পর্যন্ত নতুন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) প্রত্যাহার হতে পারে। এর ফলে হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক গাড়ির দাম কমবে এবং জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কমবে।
৭. কম্পিউটার ও মোবাইল সামগ্রী
কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও মনিটর আমদানির যন্ত্রাংশে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হতে পারে। দেশে উৎপাদিত ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও মোবাইলের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। এছাড়া, স্থানীয় মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ ও ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে। ফলে দেশে তৈরি কম্পিউটার সামগ্রী ও মোবাইল সেটের দাম কমতে পারে।
৮. স্বর্ণালঙ্কার
স্বর্ণ বিক্রিতে বর্তমানে প্রযোজ্য ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরিতে নির্দিষ্ট হারে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হতে পারে। বর্তমান দাম অনুযায়ী ১২-১৩ হাজার টাকা ভ্যাট দিতে হয়। এছাড়া, এই খাত থেকে বছরে ১৫০ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় হলেও ভ্যাট নির্দিষ্ট করার শর্তে বাজুস বছরে অন্তত ৪০০ কোটি টাকা ভ্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি এই খাতের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং টার্নওভার কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে। এতে স্বর্ণালঙ্কারের দাম কমতে পারে।
৯. অন্যান্য পণ্য ও সেবা
• কিডনি ডায়ালাইসিস: কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার হতে পারে, যার ফলে ডায়ালাইসিস খরচ প্রতিবারে ৬০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
• শারীরিক প্রতিবন্ধীদের ব্যবহৃত পণ্য: ১৫টি আমদানি করা পণ্যের অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১-২ শতাংশ করা হতে পারে।
• মোবাইল সিম: মোবাইল সিমের ওপর থাকা ৩০০ টাকা কর বাতিল হতে পারে, ফলে সিমের দাম কমবে।
• বাদ্যযন্ত্র ও এটিএম কার্ড: বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আমদানির ৫ শতাংশ শুল্ককর এবং এটিএম কার্ডসহ সব ধরনের কার্ড তৈরির কাঁচামাল আমদানির ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার হতে পারে। পাশাপাশি ১১৩টি পণ্যের ওপর থেকে ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার হতে পারে।
• মৃতদেহ সংরক্ষণ: মর্চুয়ারি আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে।
• সেমি কন্ডাক্টর ও টাগবোট: সেমি কন্ডাক্টর খাতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড় ২০৩১ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং টাগবোট আমদানিতে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে।
• বালাইনাশক: বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার এবং প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল সরবরাহের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হতে পারে।
• প্রসাধনী সামগ্রী: লোশন, ফেস ক্রিম ও ফেসওয়াশ আমদানিতে কেজি প্রতি শুল্ক ২০ ডলার থেকে কমিয়ে ৭ ডলার এবং লিপস্টিক আমদানিতে শুল্ক ৪০ ডলার থেকে কমিয়ে ৩০ ডলার করা হতে পারে।
দেশীয় পণ্য সুরক্ষায় যেসব বিদেশি পণ্যের দাম বাড়তে পারে
১. কাজু বাদাম ও হিমায়িত মাছ
দেশে বাণিজ্যিকভাবে কাজু বাদাম চাষ শুরু হওয়ায় দেশীয় ফলের সুরক্ষায় কাজু বাদাম আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হতে পারে। এছাড়া, পাঙাস মাছের ফিলেট আমদানিতে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং উচ্চ মূল্যের দামি হিমায়িত মাছ আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসানো হতে পারে।
২. তামাক ও সিগারেট
সিগারেটের দাম প্যাকেট প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা বাড়তে পারে। এছাড়া, খুচরা ব্যবসায়ীদের হাজারে ২ টাকা অগ্রিম কর দিতে হবে। গুল ও জর্দাতেও কর বাড়ছে। সিগারেটের ফিল্টার তৈরির পেপার আমদানিতে ৩০০ শতাংশ ও নিকোটিনে ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং নিকোটিন পাউচে ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসানো হতে পারে।
৩. দেশি ও বিদেশি মদ
দেশীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মদে প্রতি লিটারে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট (স্পেসিফিক) ভ্যাট বসানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এছাড়া, আমদানি করা বিদেশি মদের দামও বাড়তে পারে, যেগুলোতে বর্তমানে ব্র্যান্ডভেদে ৪৫০ থেকে ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-কর রয়েছে।
৪. এমএস রড
দেশে মাইল্ড স্টিল (এমএস) এবং এ জাতীয় পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর (স্পেসিফিক ট্যাক্স) ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানো হতে পারে। ফলে রডের দাম বাড়তে পারে।
৫. অন্যান্য বিলাসী পণ্য
বিদেশি প্রসাধনী, বিলাসী পণ্য, আমদানি করা উচ্চমূল্যের খাদ্যপণ্য এবং নতুন ১০টি পণ্যের আমদানি পর্যায়ে ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কারণে এগুলোর দাম বাড়তে পারে।